Wednesday , 21 October, 2020

যে ছবিটি ২০ বছরের যু,দ্ধ থামিয়ে দিয়েছিল।

১৯৭২ সালে এই ছবি তোলা হয়েছিল দক্ষিণ ভিয়েতনামের একটি গ্রামে। পিছনে কুখ্যাত নাপাম বোমার ধোঁয়া। যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে নগ্ন হয়ে দৌড়াচ্ছে নয় বছরের এক বালিকা। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক চিত্রসাংবাদিকের তোলা এই ছবি হাতে পাওয়ার পর কী করবেন, তা বুঝতে পারছিলেন না নিউইয়র্ক টাইমসের এডিটররা।

নগ্নতার জন্যই একটু ধন্দেই পড়ে গিয়েছিলেন তারা। কিন্তু সাহস করে শেষ পর্যন্ত ছবিটা তারা ছেপেই দিয়েছিলেন পরের দিনের সংবাদপত্রে। বাকিটা ইতিহাস। একটা ছবি বদলে দিয়েছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি।

পিছিয়ে যাওয়া যাক আরো দশ বছর। সময়টা ১৯৬১। ভিয়েতনামের মাটি থেকে জঙ্গল, ফসল আর সব ধরনের সবুজ চিরতরে মুছে দেওয়ার পরিকল্পনায় তখন সবুজ সঙ্কেত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি। সেই কাজ মসৃণ করতে রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির বরাত দেওয়া হয়েছে বহুজাতিক রাসায়নিক সংস্থা মনস্যান্টো আর ডাউ কেমিক্যালসকে।

এই রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক আইন মেনেই এবং এর আগেও এই ধরনের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের নজির আছে, এমনটাই যুক্তি ছিল মার্কিন প্রশাসনের। যেমন ভাবা, তেমনই কাজ। জঙ্গলের আড়ালে লুকিয়ে থাকছে গেরিলারা, তাই ধ্বংস করে দিতে হবে সমস্ত রকমের সবুজই। দক্ষিণ ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট গেরিলাদের জব্দ করতে এর পরই ভিয়েতনাম জুড়ে গ্যালন গ্যালন রাসায়নিক ঢালতে শুরু করে মার্কিন সেনারা।

রামধনু রাসায়নিক। কুখ্যাত এই বিষকে এই নামেই ডাকতো মার্কিন বহুজাতিক সংস্থাগুলি। এই নামেই তা পরিচিত ছিল মার্কিন সেনাদের কাছেও। কারণ আমেরিকা থেকে তা ভিয়েতনামে নিয়ে যাওয়া হত গোলাপি, সবুজ, লাল, সাদা, কমলা রঙের বাহারি ড্রামে।

১৯৬১ সালে এই রাসায়নিক ব্যবহারের সবুজ সঙ্কেত পাওয়ার পর পরের দশ বছরে ভিয়েতনামে ঢালা হয়েছিল এই সাতরঙা বিষের মধ্যে সব থেকে কুখ্যাত ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’। সব মিলিয়ে মোট সাড়ে চার কোটি লিটার ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’।

রাসায়নিক দিয়ে সবুজ ধ্বংসের পাশাপাশি রাসায়নিক দিয়ে গাছ জ্বালানোর অভিযানেও নেমেছিল আমেরিকা। সেই কাজে তাঁদের হাতিয়ার ছিল নাপাম বোমা। প্লাস্টিক পলিয়েস্টিরিন, হাইড্রোকার্বন বেঞ্জিন আর গ্যাসোলিন দিয়ে তৈরি এই জেলির মতো রাসায়নিক মিশ্রণ ভিয়েতনাম জুড়ে ফেলেছিল মার্কিন সেনারা।

কখনও স্প্রে করে, কখনও বা সরাসরি বোমা ফেলে জ্বালিয়ে দেওয়া হত জঙ্গল, ঘরবাড়ি সব কিছুই। এই রাসায়নিকে আগুন লাগলে তা জ্বলতে থাকে দশ মিনিট ধরে, তাপমাত্রা পৌঁছয় ১০০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে। নাপাম বোমার সেই জ্বালাই টের পেয়েছিল ৯ বছরের বালিকা কিম ফুক। তাঁর বাড়ি ছিল দক্ষিণ ভিয়েতনামের একটি গ্রামে। ভিয়েতনাম জুড়ে তখন নাপাম বোমা আর কুখ্যাত এজেন্ট অরেঞ্জ ঢালছে মার্কিন সেনা।

স্থানীয় কাওদাই মন্দির চত্বর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে রওনা দিয়েছিল কিম ফুক ও তার গ্রামের লোকজন। বোমারু বিমান রেহাই দেয়নি তাঁদের। ওপর থেকে ফেলতে থাকে নাপাম বোমা।

বোমার আঘাতে ঘটনাস্থলেই মারায় যায় কিম ফুকের চার পড়শি। বোমায় জ্বলে যায় তাঁর দেহের একটা অংশ। জ্বলে যাচ্ছে! জ্বলে যাচ্ছে! এই চিৎকার করতে করতেই দৌড়াতে থাকেন কিম। সেই মুহূর্তই লেন্সবন্দি করেছিলেন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের চিত্রসাংবাদিক নিক উট, যা প্রকাশিত হয়েছিল নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায়।

এই ছবি এতটাই প্রভাব ফেলেছিল জনমানসে, যে শুধু এই ছবি নিয়েই আলোচনায় বসেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন। সামনে এসেছিল মার্কিন সেনাপ্রধানের সঙ্গে তাঁর সেই আলাপচারিতার অডিও টেপ। সেখানে নিক্সনকে বলতে শোনা যায়,আমার মনে হচ্ছে এই ছবি সাজানো।

এ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন নিক উট। তিনি প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, আমার তোলা এই ছবি ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতোই সত্য। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ভয়াবহতা রেকর্ড করার জন্য কোনও কিছু সাজানোর দরকার নেই।

সেদিন ছবিটা তোলার পরই নয় বছরের কিম ও অন্যান্য শিশুদের নিয়ে হাসপাতালের দিকে দৌড়েছিলেন নিক উট। সাইগনের হাসপাতালে পৌঁছনোর পর চিকিৎসকেরা জানিয়ে দিয়েছিলেন কিমের বাঁচার সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু হাল ছাড়েননি নিক উট। ১৪ মাস হাসপাতালে রেখে সারিয়ে তুলেছিলেন কিমকে। করতে হয়েছিল মোট ১৭টি অস্ত্রোপচার, তার মধ্যে ছিল পুড়ে যাওয়া ত্বক প্রতিস্থাপনও।

১৯৭৩ সালে সারা পৃথিবীর চিত্রসাংবাদিকদের বিচারে সেরা ফোটো নির্বাচিত হয় এই ছবি। কিমের কথা সামনে আসায় নিন্দার ঝড়ে উঠেছিল সারা বিশ্ব জুড়ে। দেশের মাটিতে ও মার্কিন সরকারের ভিয়েতনাম নীতির বিরুদ্ধে রাস্তান নামেন মার্কিন নাগরিকেরা। যা দেখে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন মার্কিন প্রশাসন ও মার্কিন সেনার কর্তাব্যক্তিরা।

দেশের ভাবমূর্তি তলানিতে পৌঁছে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ভিয়েতনাম আগ্রাসনের তীব্রতা কমাতে বাধ্য হয় আমেরিকা। কয়েক বছর পর সাইগনের পতন হয়, থামে ২০ বছর ধরে চলতে থাকা কুখ্যাত ভিয়েতনাম যুদ্ধ। এই কুড়ি বছরে অবশ্য ভিয়েতনাম হয়ে গিয়েছে এমন একটা জায়গা, যেখানে পৃথিবীর মধ্যে সব থেকে বেশি বোমা ফেলা হয়েছে, মাইলের পর মাইল জঙ্গল ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, অধিকাংশ চাষ জমি হয়ে গিয়েছে অনাবাদী, প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩০ লক্ষ সাধারণ মানুষ।

লিখেছেন-Utpal Bapi Mukherjee সূত্র: ওড বাংলা

About Lipu Chowdhury

Check Also

উপরে যেতে পারছিলেন না বৃদ্ধা, সিঁড়িতেই আদালত বসালেন বিচারক।

আদালতের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারছিলেন না এক বৃদ্ধা। হতাশ হয়ে বসেছিলেন সিঁড়ির গোড়ায়। পরে খবর ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *